বনধ ইস্যুতে ফের উত্তপ্ত পাহাড়
কার্শিয়াং: বিমল গুরুং এর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বন্ধ প্রত্যাহার করলেন মোর্চারই মুখপাত্র বিনয় তামাং। ফলে, মোর্চায় অন্তর্দ্বন্দ্ব চরমে । নবান্নে সর্বদল বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার পাহাড়ে ফিরেই কার্শিয়াঙে সভা করেন বিনয় তামাং। সেখানেই বিনয় জানান, পাহাড়ের মানুষের মনের কথা বুঝেই তাঁরা ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ প্রত্যাহার করছেন।আর , আগামী ১২ সেপ্টেম্বরই উত্তরকন্যায় বসবে সর্বদল বৈঠক। সেই বৈঠকে থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।বিনয়দের এই ঘোষণার পরই মরিয়া বিমল গুরুং মরিয়া বিমল গুরুং টেলিফোনে জানিয়ে দেন, বন্ধ প্রত্যাহার করা হচ্ছে না। উল্টে বিনয় তামাং এবং অনিত থাপাকে তাঁদের দলীয় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়ে আজ, শুক্রবার মোর্চার কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছে।মোর্চার এই বিরোধে বন্ধ নিয়ে বিপাকে পাহাড়ের মানুষ। বৃহস্পতিবার বিনয় তামাঙের ঘোষণায় খুশি হয়েছিলেন পাহাড়ের মানুষ । কয়েকটি এলাকায় দোকান খুলতেও শুরু করেছিল। কিন্তু বিমল গুরুং এবং রোশন গিরিদের বন্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণায় সংকটে পড়েছেন।বিমল গুরুং এবং বিনয় তামাঙের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই বিরোধ তৈরি হয়েছে। তা আরও পরিষ্কার হয়ে যায় নবান্নে সর্বদল বৈঠকে বিনয়-সহ মোর্চার ৫ প্রতিনিধি যোগ দেওয়ায় । আত্মগোপন করে থাকা বিমল গুরুং বিনয়দের বিশ্বাসঘাতক বলে মন্তব্য করেন। এদিন কার্শিয়াঙে তারই জবাব দিতে আক্রমণাত্বক ছিলেন বিনয়। এদিনের সভায় বিনয় দার্জিলিঙের সাংসদকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বিমল গুরুং, রোশন গিরির বিরুদ্ধে তোপ দেগে, ১২ দিনের জন্য বন্ধ প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, শুক্রবার থেকেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে গোটা পাহাড়। ঘোষণা করলেন, 'আমার ওপর ভরসা রাখুন। গোর্খাল্যান্ড আমিই এনে দেব।' উল্লেখ্য পাহাড়ের ইতিহাসে এই প্রথম গুরুংয়ের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করলেন মোর্চারই কোনও নেতা। বিমল গুরুং, রোশন গিরিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি বলেন, লুকিয়ে না থেকে পাহাড়ে এসে মানুষের মনের কথা বোঝার চেষ্টা করুন ।এদিকে বিনয় তামাং যখন বন্ধ তোলার ঘোষণা করলেন, তখন গোপন ডেরা থেকে বিমল গুরুঙের ঘোষণা বন্ধ চলছে এবং চলবে। দিল্লির সঙ্গে কথা না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয় । দিল্লি থেকে মোর্চা সচিব রোশন গিরিও একই বক্তব্য জানান। শুধু তাই নয়, বিনয়ের নির্দেশের বিরুদ্ধে পাহাড় জুড়ে মিছিলেরও নির্দেশ দেওয়া হয়। রাতেই দার্জিলিং-সহ বিভিন্ন এলাকায় বন্ধ চালিয়ে যাওয়ার পোস্টার লাগানো হয় মোর্চার তরফে। ২৯ আগস্ট নবান্নে সর্বদলীয় বৈঠকের পর ৩০ তারিখেই হরকাবাহাদুর ছেত্রি, মন ঘিসিংয়ের মতো অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা পাহাড়ে চলে আসেন। কিন্তু বিনয় তামাং কলকাতা থেকে রণকৌশল ঠিক করে বৃহস্পতিবার দুপুর নাগাদ বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিনয়দের স্বাগত জানাতে ভিড় জমতে থাকে। প্রচুর গাড়ি নেমে আসে সমতলে। জনতার সেই কনভয়ের সঙ্গেই বিনয় তামাং পাহাড়ে ওঠেন । কার্শিয়াঙের মোটরস্ট্যান্ডে টেবিলের ওপর দাঁড়িয়েই ভাষণ দেন। গুরুং সমর্থকেরা পাহাড় জুড়ে যেভাবে বিনয় তামাংকে বিশ্বাসঘাতক বা বিভীষণ হিসেবে চিহ্নিত করছিল , তার জবাব দেন বিনয়। মানুষের সঙ্গে থেকে গোর্খাল্যান্ডের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেন তিনি । এরপরই বিমল গুরুঙ্গের বিরুদ্ধে তোপ দেগে বলেন, 'বিমল গুরুং হাওয়ায় শুনে অডিও রেকর্ড পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এ সব বন্ধ করুন।' এরপর সাপ-নেউলের একটি গল্পও শোনান।বাড়ির কর্তা বাড়িতে শিশুপুত্রকে রেখে কাজে বেরিয়েছিলেন। ফিরে এসে ঘরে ঢোকার মুখে তিনি দেখেন রক্তাক্ত নেউল দরজা দিয়ে বের হচ্ছে। বাড়ির কর্তা ভাবলেন তার শিশুটিকে হত্যা করেই নেউল পালাচ্ছে। কর্তা দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে নেউলকে মেরে ফেললেন। এরপর ঘরে ঢুকে দেখেন তার শিশুটি দিব্যি আছে। পাশে মরে পড়ে আছে একটি বিষধর সাপ। বাড়ির কর্তা মাথায় হাত দিয়ে কেঁদে উঠলেন। এভাবে মোর্চায় যেন সাপ-নেউলের মতো ঘটনা না ঘটে। দলের মধ্যে এমন কোনো বিশ্বাসঘাতক আছে, যাঁরা বিভেদের প্রাচীর তৈরির চেষ্টা করছেন। গুরুংয়ের সতর্ক হওয়া উচিত।' রোশন গিরিকেও এক হাত নেন তিনি। বলেন, 'আড়াই মাস ধরে দিল্লিতে পড়ে আছে। কী করতে পেরেছে ? যদি কিছু করতে না পারেন, দল ছেড়ে দিন। দলের সম্পাদকের দায়িত্ব সামলানোর জন্য বহু নেতা আছে।' এদিনের সভায় বিজেপি-র সাংসদ সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়াকেও ছেড়ে কথা বলেননি তামাং। বলেন, 'আড়াই মাস ধরে আন্দোলন চলছে , একবারও খোঁজ নেওয়ার সময় হয়নি ওনার । চুপি চুপি দিল্লি-কলকাতা করে বেড়াচ্ছেন অথচ , পাহাড়ে আসার সময় হয় না। আমি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলছি, আপনাকে ছাড়াই ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের ব্যবস্থা করব আমরা। ' প্রকাশ গুরুং, দীপেন মালে, প্রবীণ সুব্বাদের নাম তুলে ধরে হুশিয়ারী দিয়ে তিনি জানান, 'এরা গুরুংয়ের কান ভারী করছে ।' এরপর জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন , 'আমি নবান্নের বৈঠকে নিজের জন্য যাইনি । পাহাড় নিয়ে আলোচনার দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।আমি সেই দরজা খুলে দিয়েছি। গোর্খাল্যান্ডের দাবি তুলতে এবং আমাদের নেতাদের বাঁচাতেই আমি নবান্নে গিয়েছিলাম । তিনি জানান, 'বিমল গুরুং কোথায় জানি না। রোশন গিরি দিল্লি থেকেই নির্দেশ দিচ্ছেন বন্ধের।আর আমি ময়দানে থেকেই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। আপনারা আগে ময়দানে এসে দেখুন পাহাড়ের মানুষ কী কষ্টের মধ্যে আন্দোলন করছে।তাদের দুর্দশার কথা অনুভব করুন ।