সর্বোচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায় : তিন তালাক নিষিদ্ধ

সর্বোচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায় : তিন তালাক নিষিদ্ধ

ডেস্ক রিপোর্ট :  মঙ্গলবার  সুপ্রিম কোর্ট মুসলিম সমাজে প্রচলিত তিন তালাক প্রথাকে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করল ।

 বিভিন্ন ধর্মের পাঁচ বিচারপতিকে দিয়ে এই মামলার শুনানি করিয়ে তা বিতর্কহীন করে তোলার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রায় নিয়ে সেই বিচারপতিরাও দু’ভাগ হয়ে গেলেন। এটাই এই রায়ের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক।সুপ্রিম কোর্টে কোনও মামলার শুনানি হচ্ছে আর তাতে বিচারপতিদের ধর্ম কী, তা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে এমন কোনও দৃষ্টান্ত কখনোই ছিল না। কিন্তু তিন তালাকের বিরুদ্ধে করা সাতটি পিটিশন সুপ্রিম কোর্ট গ্রহণের পর বিচারপতিদের ধর্মও নজরে চলে আসে। কারণ বিষয়টি দেশের  ১৮ কোটি মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

এ কারণেই সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত নেয়– যে সাংবিধানিক বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হবে তাতে সব ধর্মের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। সেই অনুযায়ী বেঞ্চটি গঠন করা হয় এভাবে: প্রধান বিচারপতি জগদীশ সিং কেহের (শিখ), বিচারপতি কুরিয়েন জোসেফ (খ্রিস্টান), বিচারপতি রোহিন্টন ফলি নরিম্যান (পার্সি), বিচারপতি এস আবদুল নাজির (মুসলিম) এবং বিচারপতি উদয় উমেশ ললিত (হিন্দু)।

সুপ্রিম কোর্টের এই সাংবিধানিক বেঞ্চে যে শিখ ও মুসলিম বিচারপতি ছিলেন, তাঁরা  দু’জন মনে করেছেন তিন তালাকের মতো বিষয় মুসলিম সমাজের নিজস্ব রীতি। এক্ষেত্রে কেবল সামাজিক সংস্কার বা আইন করেই পরিবর্তন আনা যেতে পারে।

অন্যদিকে বেঞ্চের খ্রিস্টান, পার্সি ও হিন্দু ধর্মের তিন বিচারপতি রায় দিয়েছেন তিন তালাকের মৌলিক ভাবনাটাই ভারতের সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী। তাই, সোজা কথায় এই প্রথা বেআইনি। বেঞ্চের খ্রিস্টান বিচারপতি কুরিয়েন জোসেফ, কোরানের একটার পর একটা আয়াত উদ্ধৃত করে পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, তিনি নিশ্চিত যে ‘কোরান কিছুতেই তিন তালাকে সায় দেয় না। আর যে জিনিস কোরান-বিরোধী, সেটা ইসলামবিরোধী বটেই।’

চলতি বছরের মে মাসে টানা এক সপ্তাহ ধরে পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চটি তিন তালাক নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য শোনে। আর প্রধান বিচারপতি জাস্টিস কেহের অবসরে যাওয়ার মাত্র পাঁচ দিন আগে মঙ্গলবার তাঁর রায় ঘোষণা করলেন।

অনেকেই ভেবেছিলেন এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মত হবে। বিভিন্ন ধর্মের বিচারপতিরা শুনানির শেষে একমত হয়ে একটাই রায় দেবেন । মূলত সেটাই ছিল নানান ধর্মের বিচারপতিদের নিয়ে বেঞ্চ গঠনের পেছনে অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেলো তিন তালাকের বৈধতা নির্ধারণের প্রশ্নে তাঁরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেলেন। তাদের মধ্যে তিন বিচারপতি এ প্রথা নিষিদ্ধের পক্ষে, বাকি দু’জন অবস্থান নিলেন অন্যদিকে।

 ভিড়ে ঠাসা এজলাসে অপেক্ষমান কৌতুহলীদের সাক্ষী রেখে আজ এই ঐতিহাসিক রায় দিলো সুপ্রিম কোর্ট। অবশেষে , দেশের প্রধান বিচারপতি জে এস খেহরের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার রায়ে আজ জানিয়ে দিল, মুসলিম সমাজে ‘তালাক-ই-বিদ্দাৎ’ অর্থাৎ একসঙ্গে পরপর তিনবার তালাক বলার যে প্রথা দীর্ঘ ১৪০০ বছর ধরে চলে আসছিল, তা বাতিল করা হল। নিঃসন্দেহে এই রায় মুসলিম মহিলাদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বিশেষ  তাৎপর্যপূর্ণ।
ঐতিহাসিক এই রায়কে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, এই রায় ঐতিহাসিক। এর ফলে মুসলিম মহিলারা শুধু সমানাধিকারই পাবেন না, এই রায় মহিলাদের সামাজিক অবস্থানকে আরও বেশি শক্তিশালী করবে। রায়কে স্বাগত জানিয়ে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহর মন্তব্য, এটা কারও ব্যক্তিগত হারজিতের বিষয় নয়। এই রায় গণতন্ত্রের জয়। কংগ্রেসের মুখপাত্র রণদীপ সিং সুরজেওয়ালার বলেন, এই রায়ের ফলে মুসলিম মহিলাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান হল। মামলার অন্যতম আবেদনকারী তিন তালাকের ভুক্তভোগী সায়রা বানু রায় শুনে আনন্দে প্রায় কেঁদেই ফেলেন। বলেন, আজ ভারতের একটি ঐতিহাসিক দিন। 

দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিম দম্পতির মধ্যে কোনও কারণে বনিবনা না হলে পুরুষরা একতরফা ভাবে  পরপর তিনবার ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করে স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ করতেন। কয়েক হাজার বছর ধরে এই প্রথা চলে আসছিল। প্রায় একইভাবে চলে আসছে হালালা এবং বহুগামিতা। তবে, সুপ্রিম কোর্ট বহুগামী বা হালালার মতো কোনও বিষয়ে মাথা ঘামাতে চায়নি।